মনিরামপুরপ্রতিনিধি:
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর ক্ষণ মানেই এক অন্যরকম আনন্দ, যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ঢাকুরিয়া অঞ্চলের মানুষের কাছে
এই দিনটি মানেই ঐতিহ্য আর ভালোবাসার মেলবন্ধন নামে খ্যাত জামাই মেলা। ইরেজ শাসনামল থেকেই এই মেলার প্রচলন। মঙ্গলবার প্রতাপকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠ ও ঢাকুরিয়া বাজার এলাকায় এক বিশাল উৎসবে রূপ নিয়েছিল। শ্বশুরবাড়ির সম্মান রক্ষার্থে জামাইদের বড় মাছ কেনার এই ব্যতিক্রমী আয়োজন ঘিরে পুরো এলাকায় আনন্দের বন্যা। শত বছর আগে থেকে শুরু হওয়া এই মেলা কেবল একটি সাধারণ বেচাকেনার স্থান নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা পারিবারিক বন্ধন ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। প্রতিবছর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দূর্গা পূজা উৎসবের বিজয়া দশমীর এই দিনটির জন্য মুখিয়ে থাকেন এলাকার হাজারো জামাই। কার চেয়ে কে কত বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়িতে উপহার দেবেন তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। মেলায় ৫ থেকে ১৫ কেজি ওজনের রুই, কাতলা, চিতল, ব্ল্যাক কার্প, পাঙাশ ও সিলভার কার্প মাছের থালা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। একদিনের আয়োজন কোটি টাকার মাছ বিক্রির রেকর্ড রয়েছে বলে জানিয়েছে আয়োজকরা।
মেলার এই প্রাণের স্পন্দন নিয়ে ঢাকুরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ তাপস কুমার কুন্ডু বলেন, আমাদের এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই জামাই মেলা। এটি কেবল মাছ কেনাবেচার বাজার নয়, এটি আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সৌহার্দ্য এবং পারিবারিক মেলবন্ধনের এক অনন্য উৎসব।
মেলা ও বাজারের সার্বিক প্রস্তুতি প্রসঙ্গে ঢাকুরিয়া বণিক সমিতির সভাপতি গাজী আব্দুল হান্নান বলেন, অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। জামাইদের এই সম্মান ও প্রতিযোগিতামূলক মাছ কেনার ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, আজকের এই দিনেও মেলার প্রতিটি কোণে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়বে এবং প্রায় কোটি টাকার মাছ বিক্রি হবে।
অতীতের বহু স্মৃতি বুকে ধারণ করা এলাকার বয়সের ভারে নতজানু অমল ঘোষ। জীবনের বহু বছর ধরে এই মেলার সাক্ষী হয়ে আছেন, আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, চোখের পলকে কত বছর পেরিয়ে গেল! ছোটবেলা থেকে এই মেলা দেখে আসছি। আগের মতো আজও যখন দেখি জামাইরা হাসিমুখে বড় বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়ির দিকে ছুটে চলেছে, তখন বুকটা ভরে যায়। আমাদের এই মেলাই তো আমাদের সংস্কৃতি আমাদের শেকড়।
জামাই মেলায়,জামাই কিশোর রায় বলেন,আজ থেকে ঠিক ১৯ বছর আগে মনিরামপুর উপজেলার ঢাকুরিয়া ইউনিয়নের গাবখালী গ্রামের জামাই হয়েছিলাম। সেই থেকে প্রতিবছর ঢাকুরিয়া জামাই মেলা’য় আসা আমার জীবনের এক আনন্দের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আজ সকালে মেলা থেকে ১০৫০ টাকা কেজি দরে ১১ কেজির উপরে কাতল মাছটি কিনেছি।
মাছটি শুধু ওজনে ভারী নয় এর সাথে জড়িয়ে আছে আমার ১৯ বছরের স্মৃতি, ভালোবাসা এবং শ্বশুরবাড়ির সাথে আত্মিক সম্পর্কের টান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঢাকুরিয়ার এই মেলার ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন।
খুলনা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও ঢাকুরিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, ঢাকুরিয়ার জামাই মেলা আমাদের এলাকার গর্ব ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু মাছ কেনাবেচার মেলা নয়, বরং পারিবারিক বন্ধন, ভালোবাসা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে আমাদের শেকড় ও আবেগ জড়িয়ে আছে। তাই এর সংরক্ষণ ও বিকাশে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে মেলার নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে এই লোকঐতিহ্যকে জাতীয় পর্যায়ে আরও পরিচিত করা সম্ভব।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেন। জামাই মেলা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে বলেন, বাংলার এই সুপ্রাচীন লোকসংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্য আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। জামাইদের মাছ কেনাকে কেন্দ্র করে ঢাকুরিয়ার এই মেলা যেভাবে পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং মেলায় আগত মানুষের নিরাপত্তা ও আনন্দ নিশ্চিত করতে প্রশাসন সবসময় পাশে রয়েছে।
শুধু মাছ কেনা নয়, মেলাকে ঘিরে প্রতাপকাটি প্রাঙ্গণজুড়ে বসেছে নাগরদোলা, হরেক রকমের মিষ্টির দোকান ও গ্রামীণ নানা আয়োজন। জামাইদের বরণে বাড়ির অন্দরে চলছে পিঠাপুলির আয়োজন, আর চারপাশের এই বর্ণিল উৎসবে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব বয়সের মানুষের সমাগমে এটি হয়ে উঠেছে সত্যিকারের এক অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলা।