সম্পাদকীয়
রাজধানী ঢাকায় টানা বৃষ্টিতে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অফিসগামী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। খেটেখাওয়া শ্রমজীবী মানুষের আয়ের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব।
আবহাওয়া অধিদফতর রাজধানীতে গত রোববার ২৪ ঘণ্টায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে, যা গত ১৭ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে ২০০৯ সালে ঢাকায় এক দিনে সর্বোচ্চ ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় রয়েছে। বর্ষাকালে এমন বৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। প্রশ্ন হচ্ছে, বৃষ্টি হলেই রাজধানী কেন অচল হয়ে পড়ে? ঢাকার জলাবদ্ধতা কি প্রাকৃতিক নাকি এটা দীর্ঘদিনের নগর অব্যবস্থাপনার ফল?
প্রতি বর্ষায় এই মহানগরীতে জলাবদ্ধতার একই চিত্র দেখা যায়। গত এক দশকের বেশি সময়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার দায়িত্বে একসময় ছিল ওয়াসা। সেই দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দায়িত্বের হাতবদলই হয়েছে কেবল, বাস্তব পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
বর্জ্য জমে নগরীর ক্যাচপিট ও ড্রেনগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দখল-ভরাটে অনেক খাল ইতিমধ্যে অস্তিত্ব হারিয়েছে, যেগুলো এখনও টিকে আছে সেগুলোও ধুঁকছে। ঢাকার চারপাশের নদীর পানির ধারণক্ষমতা কমেছে। নদী-নালার রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সমন্বয়ের অভাব। এককথায় রাজধানীর বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহে নিষ্কাশনের পুরো ব্যবস্থাই মুখ থুবড়ে পড়ছে।
মেগাসিটি হিসেবে ঢাকার আয়তন সামান্যই। প্রায় ৩৬০ বর্গকিলোমিটার। কিন্তু বাসিন্দা কমবেশি আড়াই কোটি। অবশ্য জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস’-এর নতুন শহরের সংজ্ঞা অনুযায়ী বৃহত্তর মেগাসিটি অঞ্চলে ঢাকার মোট জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখে পৌঁছেছে, যা ঢাকাকে বিশ্বের ২য় বৃহত্তম জনবহুল মেগাসিটিতে পরিণত করেছে। জলবায়ু বদলে গেছে। স্বল্পসময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় পুরোনো ড্রেনেজ অবকাঠামোয় ঢাকার আর চলছে না। প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
বৃষ্টির সময় দুই সিটি করপোরেশন মাঠপর্যায়ে কর্মী মোতায়েন করেছে। জমে যাওয়া পানি অপসারণে পাম্প চালু করেছে। তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় ছিল। তবে এগুলো মূল সমস্যার সমাধান নয়। সমস্যা সমাধানে আরও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদে বর্ষাকালজুড়ে ক্যাচপিট, ড্রেন, বক্স কালভার্ট ও খাল নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। অকার্যকর পাম্পিং স্টেশন সচল করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে নদী, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধারকে কেন্দ্র করে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। নগর উন্নয়ন প্রকল্পে পানি ধারণের স্থান, প্রাকৃতিক নিষ্কাশনপথ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোকে বাধ্যতামূলক করা দরকার।
ঢাকার জলাবদ্ধতা নগর পরিচালনার সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিচ্ছিন্ন প্রকল্প দিয়ে এই সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। দায়িত্ব এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করলেই সমস্যা মেটে না। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে হবে। যার যার কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে নাগরিক ভোগান্তির অবসান হতে পারে।