কক্সবাজার উখিয়া প্রতিনিধি : সরোয়ার আলম,
কক্সবাজারের উখিয়া বাজারে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে রতন গংদের সংবাদ সম্মেলন, আসন্ন দুর্গাপূজা উদ্যাপন না করার ঘোষণা এবং প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সমঝোতার উদ্যোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে, নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলন করেছে মুন্সি পরিবারও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি রতন গংরা এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দাবি করেন, মুন্সি পরিবারের কাছ থেকে তাঁদের দাবিকৃত জায়গা উদ্ধার করা না হলে তাঁরা আসন্ন পূজা উদ্যাপন করবেন না। এ দাবিকে সামনে রেখে উপজেলা প্রশাসনসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে স্মারকলিপি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও জানা গেছে।
প্রশাসনের মধ্যস্থতায় বৈঠক
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সরওয়ার জাহান চৌধুরীর উদ্যোগে উভয় পক্ষকে নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিরোধপূর্ণ স্থানে আংশিক ভেঙে যাওয়া দেয়াল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
একই সঙ্গে শর্ত দেওয়া হয়, রতন গংদের দায়ের করা আপিল মামলার রায় বা ডিক্রি না হওয়া পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ স্থানে কোনো পক্ষই প্রবেশ করতে পারবে না।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চুক্তি সম্পাদনে বিলম্বের মধ্যে রতন গংদের পক্ষ থেকে নতুন করে কিছু দাবি উত্থাপন করা হয়। তাঁদের দাবি, অবশিষ্ট দেয়ালও সংস্কার করে দিতে হবে। অন্যথায় আসন্ন পূজা বন্ধ রাখার কথাও বলা হয় বলে সূত্রটি জানিয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
ফের বৈঠক, আলোচনায় টিনের বেড়া
বিষয়টি পুনরায় প্রশাসনের নজরে এলে ইউএনও পান্না আক্তার মুন্সি পরিবারকে ডেকে আবারও বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সরওয়ার জাহান চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মুন্সি পরিবারের পক্ষ থেকে বিরোধপূর্ণ স্থানে টিনের বেড়া দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় আসে।
পরবর্তী সময়ে মুন্সি পরিবারও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ও অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে। ফলে বিরোধপূর্ণ জমির মালিকানা, দখল এবং প্রশাসনের মধ্যস্থতায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় আসে।
২৫ শতক জমি নিয়ে বিরোধ, নথিতে কী আছে?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিরোধপূর্ণ জমিটি বিএস ৭০২৯ দাগে অবস্থিত, যার পরিমাণ আনুমানিক ২৫ শতক। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রতন গংদের দখলে মোট প্রায় ৭০ শতক জমি রয়েছে। তবে জমির সীমানা, বর্তমান দখল এবং মালিকানার বিষয়টি ভূমি-সংক্রান্ত মূল নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, জমিটির মূল মালিক জেলা প্রশাসক। তবে ১৯৮৬-৮৭ সালের ১/৮৬-৮৭ নম্বর শ্রেণি পরিবর্তন মামলায় জাকের মুন্সির নাম প্রস্তাব ও সুপারিশসহ জেলা প্রশাসক কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, অনুমোদনের শর্ত এবং পরবর্তী ভূমি রেকর্ড যাচাইয়ের মাধ্যমে জমির বর্তমান আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করা জরুরি।
আদালতের সিদ্ধান্তই হোক বিরোধ নিষ্পত্তির ভিত্তি
জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধের বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কোনো পক্ষের দাবিকেই একতরফাভাবে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া সমীচীন নয়। আদালতের আদেশ, সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড এবং প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি বা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে বিরোধের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। প্রশাসনের দায়িত্ব হবে উভয় পক্ষের বক্তব্য নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং আদালতের প্রক্রিয়াকে সম্মান জানিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
উখিয়াবাসীর প্রত্যাশা, জমি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের অবসান ঘটবে আইনি প্রক্রিয়ায়, বজায় থাকবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং আসন্ন ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে উদ্যাপনের পরিবেশ নিশ্চিত হবে।