নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি চিকিৎসকদের বদলি ও পদোন্নতিতে দিতে হয় ৫ থেকে ২০ লাখ টাকা; বনিবনা না হলে আটকে রাখা হয় ফাইল, ঠিকাদারদের কার্যাদেশ পেতে গুনতে হয় ২ থেকে ৫ শতাংশ হারে কমিশন। নথি অনুমোদন বা দপ্তরের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন ইত্যাদি বিষয়েও মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর অনুমতি বা অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। এসব অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী।
তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘন, চিকিৎসকদের বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো একটি অভিযোগপত্রে এসব অনিয়মের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে স্বাস্থ্য খাতে সংঘটিত অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রকৃত চিত্র সবার সামনে উন্মোচন হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানকে লেখা এই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিধি অনুসরণ করা হচ্ছে না এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া হচ্ছে। এতে মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, চিকিৎসকদের বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং আর্থিক লেনদেনের একটি অভিযোগ বহুদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচিত। চিকিৎসকদের বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয় এবং সমঝোতা না হলে সংশ্লিষ্ট নথি দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়। একই সঙ্গে ঠিকাদারি বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রেও কমিশন গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল ইউনির্ভাসিটি ১২০০ শয্যার হাসপাতাল ও ক্লিনিক ফ্যাকাল্টির ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আহ্বানকৃত একটি দরপত্রের মূল্যায়নের ধারাবাহিকতা উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। দরপত্রের লোয়েস্ট বিডার হয় ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন। দ্বিতীয় লোয়েস্ট হয় এইচআইসিসি-এমসিএইচএল জেভি, তৃতীয় লোয়েস্ট হয় স্পেক্ট্রা-ইউসিসি জেভি এবং চতুর্থ হয়েছে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লি.। এর মধ্যে এনডিইর ব্যাংক গ্যারান্টির এক্সটেনশন পেপার ছিল না এবং স্পেক্ট্রার প্রদত্ত কাগজপত্রে অসংগতি ধরা পড়ে। সামগ্রিক বিবেচনায় এবং পিপিআর আইন অনুসারে কাজ পাওয়ার কথা ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনের। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কার্যাদেশ প্রদান না করে চার মাস নথি আটকে রাখা হয়, পরবর্তী সময়ে এইচআইসিসি-এমসিএইচএল জেভিকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লি.-এর প্রস্তাবিত ব্যয় ছিল ৪৯৭ কোটি ৩৩ লাখ ২১ হাজার ৩৬২ টাকা, অন্যদিকে এইচআইসিসি-এমসিএইচএল জেভি প্রস্তাবিত ব্যয় ছিল ৫৩৯ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার ৩২৫ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৪০ কোটি টাকা বেশিতে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে, স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীর পক্ষ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করলে ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন অপারগতা প্রকাশ করায় কার্যাদেশ পায়নি।
অভিযোগে থেকে জানা গেছে, সচিব নিজের পছন্দের কয়েকজন কর্মকর্তাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে বহাল রেখে তাদের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত করছেন (এই কর্মকর্তারা বিগত সময়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন) বিশেষ করে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নথি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় করা হচ্ছে না।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ডেলিগেশন অব ফিন্যান্সিয়াল পাওয়ার অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারাধীন কেনাকাটা/আর্থিক সব নথি মন্ত্রী পর্যায়ের অনুমোদন নেওয়ার কথা। তবে অনেক নথি সচিব নিজেই অনুমোদন করে থাকেন। স্বাস্থ্য সচিবের দপ্তরে নথি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে রাখা হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ১০ থেকে ৩০ দিন, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় স্বাক্ষরের অপেক্ষায় থাকে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে বলেও জানান তারা। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, বর্তমান সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সচিবের সম্পদ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর এক নেতা বলেন, নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী সমন্বিতভবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা না করে অনেকটা স্বেচ্ছাচারীভাবে পরিচালিত করছেন। এতে বর্তমান সরকারের প্রত্যাশা অনুসারে স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করতে পারছে না। অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে গত মঙ্গল ও বুধবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি তার ব্যক্তিগত ফোনে শর্ট মেসেজ দিলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেননি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়গুলো এরই মধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।বাংলাদেশ সংবাদ
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, রাষ্ট্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়াই অনভিপ্রেত বিষয়। জনপ্রশাসনের জন্য অস্বস্তিকর এবং বিব্রতকর। রাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তার উচিত কাজে নিজের স্বচ্ছতা ধরে রাখা এবং সমালোচনার ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করা। প্রসঙ্গত, চলতি বছরের গত ৩ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে চুক্তিভিত্তিক সচিব হিসেবে নিয়োগ পান মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার উপসচিব মো. গোলাম রাব্বানী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুসারে ২০১৮-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে এক বছর মেয়াদে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা হয় তাকে।