মোঃ আবুল হাসেম মিয়াজী
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার সন্দেহভাজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য জাহিদুল ইসলাম ও তনুর সহপাঠি ফয়সাল আহমেদ রাব্বীর ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১৭ জুলাই কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হক এ নির্দেশ প্রদান করেন। সাবেক সেনাসদস্য জাহিদুল ইসলাম সম্পর্কে তেমন কিছু জানা না গেলেও তনুর সহপাঠি ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাসের সাবেক ছাত্র ফয়সাল আহমেদ রাব্বী গত ৪/৫ মাস আগে মালয়েশিয়া চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
সাবেক সেনা সদস্য জাহিদুল ইসলাম সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলার মেঘাই গ্রামের সোলায়মান হোসেনের ছেলে জাহিদুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদ রাব্বীকুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলা রাজাপাড়া লক্ষীনগর গ্রামের এম এ মান্নানের ছেলে।
মঙ্গলবার সাবেক সেনা সদস্য ও তনুর বন্ধুর ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলাম।
জানা গেছে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শকমোঃ তরীকুল ইসলাম আবেদন করে জানান মামলাটি তদন্তকালীন সময়ে ভিকটিমের পরিধেয় জব্দকৃত জামা-কাপড়ের ডিএনএ রিপোর্ট পর্যালোচনায় একাধিক পুরুষের সম্পূর্ণ ডি এন এ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এসব ডিএনএ প্রোফাইল যাছাইয়ের জন্য অত্র মামলার সন্ধিগ্ধ অভিযুক্ত সাবেক সৈনিক মোঃ জাহিদুল ইসলাম (৪১) এবং ফয়সাল আহমেদ রাব্বী (৩২)র ডিএনএ প্রোফাইল প্রস্তুতসহ তুলনামূলক পরীক্ষা করতে অভিযুক্তদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ প্রয়োজন।
তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য এবং আবেদনপত্রের বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করে আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি প্রদান এবং ক্ষমতাপত্র ইস্যু করার নির্দেশ প্রদান করে বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত এবং তদন্তের অগ্রগতির ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মামলার ভিকটিমের পরিধেয় জব্দকৃত জামা-কাপড় থেকে প্রস্তুতকৃত ডিএনএ প্রোফাইল এবং সন্ধিগ্ধ অভিযুক্তদের থেকে প্রাপ্ত ডিএনএ প্রোফাইল পর্যালোচনা করলে মামলার ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা সম্ভবপর হবে।
এর আগে সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার প্রধান সন্দেহভাজন অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান ও সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলমের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দেয় আদালত। সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলম কুয়েতে পালিয়েছেন এবং অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান সৌদী আরব পালিয়েছে। আর এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র আসামি হাফিজুর রহমান বর্তমানে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
জানা গেছে, ২০১৬ সালে তদন্ত কর্মকর্তারা অন্তত ১৩ জনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে সিআইডির ডিএনএ ল্যাবরেটরি অব বাংলাদেশ পুলিশে পাঠিয়েছিলেন। সেখানকার ডিএনএ পরীক্ষক নুসরাত ইয়াসমিনের ৬ পাতার প্রতিবেদনে এই ১৩ জনের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে সোহাগী জাহান তনুর কাপড়ে পাওয়া পুরুষের ডিএনএর মিল না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। সে সময় যাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল তারা হলেন- মাহামুদুল হাসান, মহাইমিনুল ইসলাম জিলানী, মেহেদী হাসান মুরাদ, মিজানুর রহমান সোহাগ, রকিবুল ইসলাম, রুবেল আহমেদ, সৈয়দ সাইফুল ইসলাম, শেখ পেয়ার আহমেদ, নুর আলম বাপ্পী, সোহেল রানা, ওয়ালী উল্লাহ হৃদয়, নুরুল আজম ও মোজ্জামেল হোসাইন। এদের মধ্যে ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটারের সদস্যও আছেন, যে সংগঠনে তনু নাট্যকর্মী ছিলেন। তবে নতুন করে দেওয়া আদেশে যে সহপাঠি ফয়সাল আহমেদ রাব্বীর নমুনা সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে সে সময় সংগ্রহ হয় নি। সে সময়ই তনুর বাবা অভিযোগ করে বলেছিলেন, “আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে সেনানিবাসের ভেতরে। আর তারা সেনানিবাসের বাইরের লোকদের নমুনা সংগ্রহ করে। ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটারের ছেলেদের হয়রানি করে।” পরে এই নমুনা সংগ্রহ বন্ধ হয়েছিল।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের পাওয়ার হাউস এলাকার কালা ট্যাঙ্কি-সংলগ্ন কালভার্টের পাশের পশ্চিম দিকের ঝোঁপে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর মরদেহ পাওয়া যায়। তনু ও তার পরিবার সেনানিবাসের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় বসবাস করতেন। ঘটনার সময় তিনি টিউশনি করার জন্য ১২ ইঞ্জিনিয়ার স্টাফ কোয়ার্টারে সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামানের বাসায় যান। রাত ১০টার দিকেও ফিরে আসেননি। রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে সোহাগী জাহান তনুকে উদ্ধার করা হয় এবং কুমিল্লা সিএমএইচ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। একদিন পর কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় তার বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
সে সময় ১১ ধরনের আলামত জব্দ করা হয়। সেগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি অব বাংলাদেশ পুলিশে পাঠানো হয়। দশ বছর পর এসব পরীক্ষার ৬ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মুমিনুল হকের আদালতে দাখিল করেন মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক (তদন্ত) মো. তরীকুল ইসলাম। এরপর থেকে মামলাটিতে গতি আসে।